সম্ভাবনাময় ফসল সুগার বিট

কৃষিবিদ জাহেদুল আলম রুবেল: আখ স্বল্পতা বা ত্র“টিপূর্ণ আখের কারনে যখন চিনিকলগুলোতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চিনি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে সেই সময়ে দেশে চিনির ঘাটতি পূরণ করতে এবার আবাদ হবে সুগার বিটের। সনাতনী পদ্ধতিতে চিনিকলগুলোতে আখের রস থেকে চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি শীতপ্রধান অঞ্চলের ফসল সুগারবিট থেকে চিনি ও গুড় উৎপাদনের গবেষণায় এরই মধ্যে বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনষ্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা সফলতা লাভ করেছেন। সুগারবিট থেকে গুড় ও চিনি উৎপাদনের পর ইক্ষু গবেষণা ইনষ্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা আশা করছেন চলতি বছর থেকেই দেশে সুগারবিট উৎপাদন ও এ থেকে বাণিজ্যিকভাবে চিনি ও গুড় তৈরী সম্ভব।

শীতপ্রধাণ অঞ্চলের ফসল সুগারবিট দেখতে অনেকটা মূলার মতন। জমিতে চারা রোপণের ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সুগারবিট জমি থেকে তোলা যায়। ইক্ষু গবেষণা ইনষ্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানান, যেখানে আখ থেকে শতকরা ৬ থেকে ৭ ভাগ চিনি পাওয়া যায় সেখানে সুগারবিট থেকে শতকরা ১৪ থেকে ১৮ ভাগ চিনি উৎপাদনে তারা সক্ষম হয়েছেন। এর পাশাপাশি লবনাক্ত এলাকায় সুগারবিটের পরীক্ষামূলক চাষ করে সফলতা পাওয়ার পর বিজ্ঞানীরা দেশে সুগারবিটের উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভবনার আশা করছেন। আর এ কারণেই তারা ভাবছেন বাণিজ্যিকভাবে সুগারবিটের উৎপাদন ও চিনিকলগুলো গুলো সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদনে সক্ষম হলে দেশের চিনির ঘাটতির বিরাট অংশ পূরণ হবে।

ইক্ষু গবেষণা ইনষ্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহম্মদ খলিলুর রহমান জানান, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ২৩ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি চাহিদার দেশে যে চিনি উৎপাদন হয় তার পরিমাণ খুবই কম। শুধুমাত্র গত বছরে দেশে ১৫টি চিনিকলের উৎপাদন ক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টনের বিপরীতে চিনি উৎপাদন করা হয়েছে মাত্র ৬৯ হাজার ৩০৮ মেট্রিক টন। ঘাটতি থাকা বিপুল পরিমাণের এই চিনি বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। পাশাপাশি দেশের চিনিকলগুলো শুধুমাত্র আখের রস থেকে চিনি উৎপাদন করে থাকে। তিনি আরো জানান, আখ একটি দীর্ঘমেয়াদী ফসল হওয়ায় একদিকে আখচাষীরা তাদের জমিতে শুধুমাত্র আখের আবাদে দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর পাশাপাশি দেশে বিভিন্নভাবে কৃষি জমি কমে যাওয়ায় আখ উৎপাদনও কমছে। ফলে প্রয়োজনীয় আখ না পাওয়ায় চিনি উৎপাদনের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। ফলে দেশের চিনির চাহিদা পূরণ এবং চিনিকলগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য চিনি উৎপাদনের বিকল্প উৎস সুগারবিট ব্যবহার করার জন্য ইক্ষু গবেষনা ইনষ্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ২০০২-২০০৩ মৌসুম থেকে গবেষনা শুরু করেন। ২০১১-২০১২ মৌসুমে এজন্য একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ইক্ষু গবেষণা ইনষ্টিটিউট সহ দেশের কয়েকটি স্থানে সুগার বিটের দুইটি জাত শুভ্রা ও কাবেরীর পরীক্ষামূলকভাবে সুগারবিটের আবাদ করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে আবাদ করা সুগারবিটের মধ্যে শুভ্রা জাত প্রতি হেক্টরে ৮২ দশমিক ৩৩ মেট্রিক টন এবং কাবেরী জাত প্রতি হেক্টর থেকে ৭৫ দশমিক ৭৭ মেট্রিক টন উৎপাদন পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উৎপাদিত সুগারবিট থেকে গড়ে শতকরা ১২ দশমিক ০১ ভাগ চিনি আহরন সম্ভব হয়েছে বলেও তারা জানান। এই গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলকভাবে লবনাক্ত প্রবণ এলাকা বলে পরিচিত সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাটে সুগারবিটের ঐ দুইটি জাত আবাদ করে হেক্টর প্রতি ৬৭ থেকে ৭৭ মেট্রিক টন পর্যন্ত ফলন পেয়েছেন এবং সেখানে চিনি আহরনের হার ছিলো শতকরা ১২ ভাগ। বিজ্ঞানীরা জানান, ঠাকুরগাও চিনিকল এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে আবাদ করে শুভ্রা জাতের সুগারবিটের সর্বোচ্চ ফলন হেক্টরপ্রতি ১০৬ দশমিক ২১ মেট্রিক টন এবং শ্যামপুর চিনিকল এলাকায় সর্বোচ্চ ১৩৫ দশমিক ৮৫ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া গেছে। এ থেকে বিজ্ঞানীরা এখন সুগারবিট উৎপাদন তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার চিন্তাভাবনা করছেন।

ইক্ষু গবেষণা ইনষ্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহম্মদ খলিলুর রহমান জানান, চিনিকল গুলোতে তাদের যন্ত্রপাতির সাথে অল্প কয়েকটি নতুন যন্ত্র সংযোজনের মাধ্যমে খুব সহজেই সুগারবিট থেকে সাদা চিনি উৎপাদন করা সম্ভব। তিনি বলেন, সুগারবিটের সমস্যা হলো আখের মত সেখান থেকে কোনো রস পাওয়া যায় না। একারনে সুগারবিটকে স্লাইস করে কেটে ডিফিউজার মেশিনে পানিতে তা মেশালে সুগারবিটের চিনি অংশ পানিতে দ্রবীভুত হয়ে যায়। সেই দ্রবণ জাল দিয়ে সহজেই গুড় বা চিনি পাওয়া যায়। এ বছর থেকে ঠাকুরগাও সুগার মিলে সুগার বিট থেকে চিনি পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন করা হবে বলে তিনি জানান।

পাবনা সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমল কান্তি সরকার জানান, চলতি মাড়াই মৌসুমে পাবনা সুগার মিলে ৯০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৬ হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। মাড়াই এখনো চলছে। তিনি আরো জানান, মাড়াই অব্যাহত থাকলেও চলতি মৌসুমে আবর্জনাপূর্ণ আখ, পোকা যুক্ত আখ সহ নানা কারনে এই মাড়াই মৌসুমে মিলের রিকভারী হার অনেক নীচে নেমে এসেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কাংখিত লক্ষ্যমাত্রার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশংকা দেখা দিতে পারে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনষ্টিটিউটের সাম্প্রতিক কিছু সাফল্য : ১৯৫১ সালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে মাত্র ১৭ জন জনবল নিয়ে ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্রটিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ চিনিকল সংস্থার (বর্তমান বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থা) নিকট হস্তান্তর করা হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ চিনিকল সংস্থা ১৯৭৪ সালে ‘ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট’ নামে একটি প্রকল্প প্রণয়ন করে যা ঈশ্বরদীতে প্রধান কার্যালয়সহ ঠাকুরগাঁওস্থ আঞ্চলিক কেন্দ্রসহ একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাহী আদেশ বলে ইক্ষু গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনষ্টিটিউটকে বিলুপ্ত করে ‘বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করা হয়। বর্তমানে ইনষ্টিটিউটে প্রজনন বিভাগ, কৃষিতত্ব ও ফার্মিং সিস্টেম বিভাগ. শারীরতত্ব ও চিনি রসায়ন বিভাগ, রোগতত বিভাগ, কীটতত্ব বিভাগ, মৃত্তিকা ও পুষ্টি বিভাগ, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, কৃষি প্রকৌশল বিভাগ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিভাগ, অন-ফার্ম গবেষনা বিভাগ সহ ১০টি বিভাগে গবেষক, বিজ্ঞানী সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এর বাইরে বায়েটেকনোলোজী বিভাগ এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ নামের দুটো বিভাগের প্রস্তাবও অনুমোদন হয়েছে।

ইনষ্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞনিক কর্মকর্তা ড. খলিলুর রহমান জানান, ইনষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের বিজ্ঞানীরা আখের ৪১টি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। তিনি আরো জানান, গত তিন বছরে ইনষ্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা উচ্চ ফলনশীল এবং অধিক চিনি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন তিনটি জাত উদ্ভাবন করেছেন। জাতগুলো হলো ঈশ্বরদী-৩৯, ঈশ্বরদী-৪০ এবং বিএসআরআই-৪১। এর মধ্যে ঈশ্বরদী-৩৯ এবং ঈশ্বরদী-৪০ জাতের আখ স্বাভাবিক জমির পাশাপাশি লবনাক্ত প্রবণ এলাকায় আবাদ করা যায়। এর বাইরে সাম্প্রতিককালে স্বাভাবিক জমি ( প্লেইন ল্যান্ড ) এর পাশাপাশি প্রচলিত এলাকা যেমন চর এলাকা, পাহাড়ের ঢালে ইনষ্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা সফলভাবে আখ আবাদের প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছেন। বিজ্ঞানীরা জানান, আখের পাশাপাশি গুড় উৎপাদনের জন্য উচ্চ ফলনশীল তাল, খেজুর গাছের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী ফসল আখের সাথে সাথী ফসল হিসাবে একই জমিতে আলু, পেঁয়াজ, রশুন, মটরশুটি, বাধাকপি, পালংশাক, গাজর, টমেটো, বেবীকর্ণ, লেটুস, ধনে, কালোজিরা, মেথী, মুগডাল, মৌরী, তিল, কচু ইত্যাদি শষ্য সফলভাবে আবাদের প্রক্রিয়াও ইনষ্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা সফলতার সাথে উদ্ভাবন করেছেন। বিজ্ঞানীরা জানান, সফলভাবে সাথী ফসল আবাদের মাধ্যমে একটি জমির বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিতের পাশাপাশি বছরে একই জমি থেকে কমপক্ষে ৪টি ফসল পাওয়া যাবে।

আখের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন এবং অপ্রচলিত অঞ্চলে আখ চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি সহজে আখ চাষ এবং আখচাষীদের কাছে সহজে প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা চারা উৎপাদনের জন্য বার্ড চিপ কাটিং মেশিন, প্যাডেল পাম্প, জোরা সারি নালা তৈরীর যন্ত্র, মিনি হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট সহ বেশ কিছু যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। এ যন্ত্রগুলোর অনেকগুলোই কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানান।

লেখক :

সিনিয়র সহ-সম্পাদক, মফস্বল বিভাগ

দৈনিক কালের কন্ঠ

বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পাচ্ছে খলিশা মাছঃ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে খলিশা মাছের পোনা উৎপাদনে সফলতা

মো: আব্দুর রহমান : শস্য খেতে কীটনাশকের যথেচ্ছ প্রয়োগ, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ, জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা, কলকারখানার বর্জ্য নিঃসরণসহ নানা কারণে বিলুপ্তপ্রায় খলিশা মাছ। মিঠা পানির জলাশয় বিশেষ করে পুকুর, নদী, খাল, বিলে এক সময় খলিশা মাছটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। আর আমাদের দেশে খৈলশা, খলিশা, খৈইলা নামেও পরিচিত। তবে আশার কথা সম্প্রতি ময়মনসিংহের বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সুস্বাদু এ মাছটির পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছে।

তিন বছর গবেষণার পর বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন। তারা প্রথমবারের মতো খলিশা মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছেন। ফলে মাছটি চাষাবাদের জন্য পোনাপ্রাপ্তি সহজ হবে। এতে প্রজাতিটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে।

ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, ইনস্টিটিউট থেকে ইতোমধ্যে ১৮টি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এরমধ্যে পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, মহাশোল অন্যতম। সম্প্রতি পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা জাতীয় মাছের প্রাপ্যতা বাজারে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরও জানান, এসব মাছের ক্রয়মূল্য সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে আছে। পর্যায়ক্রমে সব বিলুপ্তপ্রায় মাছকে খাবার টেবিলে ফিরিয়ে আনার জন্য ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, ইনস্টিটিউটের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্র থেকে এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ গবেষণায় গবেষক হিসেবে ছিলেন সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. খোন্দকার রাশিদুল হাসান এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শওকত আহমেদ।

বিগত ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, স্বাদুপানি উপকেন্দ্র সৈয়দপুর প্রাকৃতিক উৎস্য থেকে খলিশা মাছ সংগ্রহ করে পুকুরে ব্রুড প্রতিপালন, ডিম ধারণ ক্ষমতা নির্ণয়, সঠিক প্রজননকাল চিহ্নিতকরণসহ অন্যান্য গবেষণা পরিচালনা করে আসছে।

গবেষণায় দেখা যায়, পুকুরে ৮-১০ সেন্টিমিটার (১৫-২০ গ্রামের) খলিশা মাছ পরিপক্ব হয়ে থাকে। মাছটির বয়স, আকার ও ওজন অনুপাতে ডিম ধারণ ক্ষমতা ৫,০০০ থেকে ১৩,০০০।

গবেষকরা জানান, এ মাছের প্রজনন মৌসুম মে থেকে সেপ্টেম্বর। প্রজনন মৌসুমের আগেই প্রাকৃতিক উৎস্য থেকে কিশোর বয়সের মাছ সংগ্রহ করে উপকেন্দ্রের পুকুরে ব্রুড তৈরির জন্য প্রতিপালন করা হয়। প্রজনন মৌসুমে পরিপক্ক স্ত্রী ও পুরুষ মাছ পুকুর থেকে সংগ্রহ করে হ্যাচারি ট্যাংকে ৫-৬ ঘণ্টা রাখা হয়। পরবর্তীতে হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগের ১৩-১৫ ঘণ্টা পর মা খলিশা মাছ ডিম দেয়। এরপর ২০-২২ ঘণ্টা পর ডিম থেকে রেণু পোনা উৎপন্ন হয়। সে আলোকে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে গত ১২ জুলাই মাছটির কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবনে সাফল্য লাভ করেন।

এ প্রক্রিয়ায় খলশে মাছের পোনাপ্রাপ্তি এবং চাষাবাদ সহজ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এত দিন পুকুরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এই মাছের পোনা উৎপাদন করা হতো না। শুধু নদী-খাল-বিলের মতো প্রাকৃতিক জলাশয়ে এটি বড় হতো। পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা সম্ভব হতো না। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এর পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছেন। এতে জনপ্রিয় এই ছোট মাছ পুকুরে চাষে কোনো বাঁধা থাকল না। নতুন কৌশল উদ্ভাবনের ফলে বিপন্ন এ মাছ প্রকৃতিতে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। বিভিন্ন দেশে বাহারি মাছ হিসেবেও খলশে মাছের চাহিদা রয়েছে। তবে মাছটিকে খাবারের মাছ ছাড়াও অ্যাকোরিয়াম মাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

————————————–

লেখকঃ

শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, ১২৬/গ, আশরাফুল হক হল,

বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যাল, ময়মনসিংহ-২২০২

ব্যানানা ম্যাংগো বা কলা আম

দূর থেকে দেখলে থ’ লেগে যাবেন। এ যে আম গাছে কলা! দেখতে অনেকটা সাগর কলার মত। আসলে কলা নয়, আম গাছে আমই ধরেছে। নাম তার কলা আম বা ব্যানানা ম্যাংগো। দেশের সর্বত্র এ আম পাওয়া না গেলেও ইতোমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে বেনানা ম্যাংগো। নিজের চোখে দেখেছেন হয়তো আপনিও।

থাইল্যান্ডভিত্তিক এই আম স্বাদে ও গন্ধে বেশ মনকাড়া। দেখতে কলার মতো লম্বা, পাকার সময় দুধে আলতা মেশানোর মতো হলুদ থেকে গোলাপি রঙের, আঠি চোকা পাতলা, রয়েছে প্রকৃত আমের স্বাদ। মিষ্টতা ১৯ /২০ টিএসএস এবং ৮৩% ই ভক্ষণযোগ্য। প্রচলিত জাতের চেয়ে এ আমে ফলন দ্বিগুণের বেশি।

২০১০ সালে থাইল্যান্ড থেকে এই জাতের ডগা নিয়ে এসে প্রথমে গ্রাফটিং করা হয়। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য কাজ শুরু হয়। ২০১২ সালে আসে প্রথম সাফল্য। এরপর প্রতিবছর নিয়মিত আম আসায় ২০১৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে কৃষকের মাঝে এই আমের সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়।

ব্যানানা ম্যাংগো বা কলা আম স্বাদে, গন্ধে যেমন অনন্য, তেমনি এর চাষের পদ্ধতিও সহজ। সাধারণত জুন মাসের পর থেকে দেশের বাজারে ভালো জাতের আমের প্রাপ্যতা যখন কমে আসে, তখন বাজারে আসে এই আম।

স্বরূপকাঠির ভাসমান পেয়ারার হাট

স্বরূপকাঠীর পেয়ারা দেশ ছাড়িয়ে সুখ্যাতি অর্জন করেছে বিদেশেও। স্বরূপকাঠীর পেয়ারাকে অনেকেই বলে থাকেন বাংলার আপেল। আর এই পেয়ারা কেনা-বেচার হাটও খ্যাতি পেয়েছে সর্বত্র। কারণ অন্য দশটা হাটের চেয়ে ব্যতিক্রম এই হাট। নদী বেষ্টিত ঝালকাঠির স্বরূপকাঠিতে ভাসমান পেয়ারার হাট নজর কেড়েছে সবার।

আশির দশকের প্রথম দিকে উপজেলা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্ব দিকে প্রায় আধা কিলোমিটার জুড়ে প্রতি সোম ও শুক্রবার মানপাশা বাজারের কাছে বসে এ হাট।

স্থানীয়দের মতে, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে আটঘর কুড়িয়ানায় চাষ হচ্ছে স্থানীয় জাতের পেয়ারা। জুন থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী ৫ মাস চলে বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ। এ মৌসুমে সহজে পথ চলাসহ ফলফলাদি বহনের প্রধান বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয় নৌকা। বছরের অন্য সময় নৌকার চাহিদা কম থাকলেও বর্ষা ও পানির মৌসুমকে কেন্দ্র করে জমে উঠছে নৌকার হাটও।

ছোট ছোট নৌকায় করে বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে নিয়ে আসা হয় বিভিন্ন খালের ভাসমান হাটে। সেখান থেকে বড় ট্রলার, ট্রাক ও লঞ্চযোগে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রতি হাটেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পেয়ারা কিনতে যান ব্যবসায়ীরা। তাদের পদচারণার পাশাপাশি অনেকেই যান ভাসমান এই পেয়ারার হাট দেখতে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬ শ একর জমিতে স্থানীয় জাতের পেয়ারা চাষ হয়। উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, জিন্দাকাঠী, কঠুরাকাঠী, আতা ও মাদ্রাসহ ২৬টি গ্রামে পেয়ারা চাষ হয়। ২ হাজার ২৫টি পেয়ারা বাগানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে প্রায় দেড় হাজার পরিবারের ৫ সহস্রাধিক সদস্য। পেয়ারার ফলন ভালো হলে হেক্টর প্রতি উৎপাদন হয় ৮-৯ মেট্রিক টন।

কচু চাষে লোকসান পোষাচ্ছে অনেক কৃষকের

চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে কচু চাষে সফলতা পেয়েছেন চাষীরা। দাম ভাল থাকায় লাভবানও হচ্ছেন তারা। মুখিকচু হিসেবে পরিচিত স্থানীয়ভাবে লতিরাজ জাতের কচু অনেকের কাছেই প্রিয় সবজি হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত চাহিদা বৃদ্ধি ও ভাল বাজারমূল্য পাওয়ায় বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র এলাকাসহ রাজশাহী অঞ্চলের কচুচাষীদের মুখে হাসি ফুটেছে। গতবারের লোকসানও পুষিয়ে যাচ্ছে এবার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় উপযুক্ত ভূমি, উপকূল আবহাওয়া ও স্থানীয় কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় কচুর চাষ ভাল হয়েছে। শ্রমিক, যত্ন ও চাষাবাদে স্বল্প ব্যয় হওয়ায় অনেক কৃষক কচুচাষকে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণ করেছেন অনেকে।

পবা উপজেলার ভবানীপুরের কচু চাষীরা জানান, জানুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে লতিরাজ জাতের কচু পাওয়া যায়। এই কচু চাষ মধ্য এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে মধ্য ডিসেম্বর ৮ মাস পর্যন্ত চলে। প্রতি বিঘা জমি হতে ৮০ থেকে একশো মণ পর্যন্ত কচু উৎপাদন হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় চারশ’ হেক্টরেরও বেশি জমিতে মুখি কচু ও দেড়শ’হেক্টরের বেশি জমিতে পানি কচুর চাষ হয়েছে।

তবে গত বছর কচুতে লোকসান হওয়ায় এবারে কিছুটা কম জমিতে আবাদ হয়েছে। জেলার দূর্গাপুর ও বাঘা উপজেলায় কচুর আবাদ বেশী হয়। দুর্গাপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামের এক কৃষক জানান, তিনি ২ বিঘা উঁচু জমিতে মুখি জাতের কচু চাষ করেছেন এবং এতে তিনি বাম্পার ফলনের আশা করছেন। জানুয়ারির ৩য় সপ্তাহে মুখির আবাদ করেন এবং জুলাইয়ের ৩য় সপ্তাহ থেকে মুখি উত্তোলন শুরু করেন।

জেলার পবা উপজেলার পারিলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক মোতালেব বলেন, চলতি মৌসুমে মুখি কচু চাষ করে ভাল আয় করেছেন। তিনি জানান, একজন কৃষক প্রতি শতাংশ জমি থেকে ২/৩ মণ করে মুখি কচু পেতে পারেন।

বর্তমানে স্থানীয় বাজারে লতিরাজ কচুকন্দ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে এবং দুই/তিন মাস পর এই দাম দ্বিগুণ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যান্য সবজির চেয়ে কচুর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বেশি থাকায় এর চাহিদাও বাড়ছে। এতে কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। গরু কচু গাছ খায় না এবং তা দেখাশোনার জন্য কোন শ্রমিকেরও প্রয়োজন হয় না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দুলাল ঢালী জানায়, কচু পরিবেশ-বান্ধব, বিষমুক্ত ও পুষ্টিকর শস্য। কৃষি বিভাগ কৃষকদের উচ্চ ফলনজাতের কচু চাষের জন্য পরামর্শ দিয়ে আসছে।

তিনি জানান, কৃষকরা এ অঞ্চলে সাদা ও লাল রংয়ের কচুসহ বিভিন্ন জাতের কচুর চাষ করেন। প্রায় সব জাতের কচুই পানিমগ্ন এলাকায় জন্মে থাকে। ধান চাষের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা লতিরাজ জাতের কচু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কচু চাষে খুব অল্প পরিচর্যা লাগে। তাই এর চাষে ঝুঁকিও কম।

প্রাকৃতিক উৎসের মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় বাংলাদেশ

দু্ই বছরে দুই ধাপ এগিয়ে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। গত ৯ জুলা্ই প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও-। বাংলাদেশের উপরে অবস্থানকারী দুটি দেশ হচ্ছে চীন ও ভারত। চীনের অবস্থান এক এবং ভারত দ্বিতীয়।

দুই বছর আগে প্রাকৃতিক উৎসের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। এবার বড় ধরনের অগ্রগতির পেছনে ইলিশের মূল অবদান ছিল বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা ।

দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, চাষের ও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ। চার বছর ধরে এই একই অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ এবং শুধু চাষের মাছের হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থানও আগের জায়গাতেই অর্থাৎ পঞ্চম ।

এফএও এবং বাংলাদেশের মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয় বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে নদী-হাওর-বাঁওড়-বিল ও অন্যান্য উন্মুক্ত জলাশয় থেকে আহরণ করা মাছের উৎপাদনে বাংলাদেশের উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ইলিশ। প্রাকৃতিক উৎস থেকে বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ১০ লাখ ৪৮ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ইলিশ ছিল প্রায় ৫ লাখ টনেরও বেশি। মা ইলিশ ধরা বন্ধের সময়সীমা বৃদ্ধি, জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ এবং সরকারের নানা উদ্যোগ ও ইলিশের নতুন নতুন অভয়ারণ্য সৃষ্টির ফলে তিন বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন প্রায় দেড় লাখ টন বেড়ে গেছে বলে জানান ওয়ার্ল্ড ফিশ বাংলাদেশের ইকোফিশ প্রকল্পের টিম লিডার অধ্যাপক ড. আব্দুল ওয়াহাব।

ইলিশ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান কৃষি প্রতিদিনকে বলেন, মা ইলিশ ধরার সময়সীমা গত দুই বছর ধরে ২২ করা হয়েছে। এ সময়টাতে প্রচুর ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আমরা আশা করছি ইলিশ উৎপাদন বাড়ার এ গতি অব্যাহত থাকবে।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সাতটি দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের অর্ধেকেরও বেশি আসে মাছ থেকে। প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ মাছ দিয়ে মিটিয়ে শীর্ষস্থানীয় দেশের কাতারে এখন বাংলাদেশ। যেখানে বিশ্বে গড়ে প্রাণিজ আমিষের ২০ শতাংশ পূরণ করে মাছ।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ কৃষি প্রতিদিনকে বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছে আমাদের ইনস্টিটিউট। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মৎস্য ইনস্টিটিউট থেকে ইতিমধ্যে মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক ৬০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ১৮টি মাছের পোনা উৎপাদন করেছে প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা। আর এসব উদ্যোগ মাছের উৎপাদন বাড়ার ক্ষেত্রে বড় একটি ভূমিকা রাখছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এ অর্জনে সবচে বড় কৃতিত্ব দিয়েছেন দেশের সাধারণ মৎস্যচাষি, বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণকর্মীদের। তাদের যৌথ প্রয়াসেই মৎস্য চাষে এই সাফল্য এসেছে বলে মনে করেন মন্ত্রী। এ খাতে এখনো যেসব সমস্যা রয়েছে তা দূর করতে সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জেনে নিন ডায়াবেটিস প্রতিরোধী করলার ১০ গুণ

করলা অনেকে একে করল্লা, উচ্ছা, উচ্ছে বলেও ডাকেন। একটু তিতা স্বাদ বলে এই সবজিটি কেউ কেউ খেতে চান না, অনেকে তিতা হলেও শুধু পুষ্টিগুণ ও উপকারিতার কথা ভেবে খেয়ে থাকেন। আবার কারো কাছে খাবার হিসেবেই প্রিয়। তবে করলার পুষ্টিগুণ ও উপকারিতার কথা জানলে হয়তো আপনি চমকেও যেতে পারেন। কারণ এই করলার মধ্যেই আছে অনেক রোগ প্রতিরোধের শক্তি।

প্রথমত করলায় যথেষ্ট পরিমাণ বিটা ক্যারোটিন রয়েছে, যা ব্রুকলির চেয়ে দ্বিগুন। রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। পালংশাকের দ্বিগুণ ক্যালসিয়াম এবং কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম রয়েছে এই করলায়। আর ভিটামিন সি? সেটিও করলায় যেমন আছে যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে ভিটামিন বি ক্লমপ্লেক্স, ফলিক এসিড, জিঙ্ক, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম।

১. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে করলা।
২. ব্লাড ও ইউরিন সুগার নিয়ন্ত্রণে দারুণ কাজ করে এই সবজিটি ।
৩. হার্ট ভালো রাখা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে করলার পটাশিয়াম।
৪. দাঁত ও হাড় ভালো রাখার ক্যালসিায়ামেরও যোগান পাওয়া যায় করলা থেকে।
৫. ত্বক ও চুলকে সুস্থ রাখতে ভিটামিন সি’র ও যোগান দেয় করলা।
৬. ফাইবার সমৃদ্ধ করলা কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা কমায়।
৭. এলার্জি প্রতিরোধে এর রস দারুণ উপকারি।
৮. চোখের দৃষ্টি শক্তি ভালো রাখতে সহায়তা করে করলার বিটা ক্যারোটিন।
৯. করলার আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে এবং
১০. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে করলা নানা ধরণের ইনফেকশন থেকেও রক্ষা করবে আপনাকে।

ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে করলার রস ও করলা সিদ্ধ খেতে পারেন। ১০টি গুণের বাইরেও টনিকের মত কাজ করা এ সবজিটির রয়েছে আরও ছোট ছোট অনেক গুণ। কাজেই খাবারের তালিকায় নিয়মিত রাখুন অসাধারণ এই সবজিটি।

তারুণ্য ধরে রাখা ও বিষন্নতা কমানোর স্বর্গীয় ফল কাঁকরোল

গ্রীষ্মকালীন সবজি কাঁকরোলকে স্বর্গীয় ফল বলা হয়। কারণ এতে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদানসহ দারুণ সব পুষ্টিগণ যা জটিল জটিল অনেক রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

কাঁকরোলে ক্যালসিয়াম, লৌহ, ফসফরাস, ক্যারোটিন, আমিষ, ভিটামিন-বি, শ্বেতসার ও খনিজ পদার্থ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে৷ টমেটোর চেয়ে ৭০ গুণ বেশি লাইকোপিন থাকে কাঁকরোলে, গাজরের চেয়ে ২০ গুণ বেশি বিটা ক্যারোটিন, কমলার চেয়ে ৪০ গুণ বেশি ভিটামিন সি থাকে এবং ভুট্টার চেয়ে ৪০ গুণ বেশি জিয়াজেন্থিন রয়েছে ছোট্ট এ সবজিটিতে।

আসুন জেনে নেই অনেক উপকারের মধ্য থেকে কাঁকরোলের প্রধান ১০টি উপকারিতা।

ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
কাঁকরোলের পুষ্টি উপাদান ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং ক্যান্সার কোষের সংখ্যা বৃদ্ধিকে ধীর গতির করতে পারে। এতে নির্দিষ্ট একটি প্রোটিন থাকে, যা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে প্রতিহত করতে পারে। এজন্যই কাঁকরোলকে ‘স্বর্গীয় ফল’ আখ্যা দেওয়া হয়।

অ্যানেমিয়া প্রতিহত করে
কাঁকরোলে প্রচুর আয়রন থাকার পাশাপাশি ভিটামিন সি ও ফলিক এসিড ও থাকে। এ কারণে নিয়মিত এটি খেলে অ্যানেমিয়ার প্রতিহত করা সম্ভব হয়।

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়
যাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি বা যাদের উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরলের রয়েছে তাদের নিশ্চিন্তে কাঁকরোল খেতে পারেন। এটি উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

হৃদরোগ প্রতিরোধক
যেহেতু কাঁকরোলে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে তাই এটি হৃদরোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটায়
কাঁকরোলে চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ভিটামিন, বিটাক্যারোটিন ও অন্যান্য উপাদান থাকে, যা দৃষ্টিশক্তির উন্নতিতে সাহায্য করার পাশাপাশি চোখের ছানি প্রতিরোধেও সাহায্য করে।

বিষণ্ণতা প্রতিহত করে
কাঁকরোলে সেলেনিয়াম, মিনারেল এবং ভিটামিন থাকে, যা নার্ভাস সিস্টেমের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। তাই বিষণ্ণতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে কাঁকরোল।

তারুণ্য ধরে রাখে
কোষের কার্যক্রমকে উদ্দীপিত করার মাধ্যমে এবং স্ট্রেস কমানোর মাধ্যমে বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধীর গতির করতে সাহায্য করে কাঁকরোল। কোলাজেনের গঠনকে পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে বয়সের ছাপ প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে এটি।

মেদ কমাতে কাঁকরোল
কমলার চেয়ে শতকরা ৪০ ভাগ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে কাঁকরোলে। ভিটামিন সি শরীরের অতিরিক্ত মেদ পুড়িয়ে ফেলতে সাহায্য করে।

ত্বকের যত্নে কাঁকরোল
কাঁকরোলে আছে ভুট্টার চেয়ে শতকরা ৪০ ভাগ বেশি জিযানথেন এবং গাজরের চেয়ে শতকরা ২০ ভাগ বেশি বিটা ক্যারোটিন, আছে ভিটামিন ই। এগুলো আপনার ত্বককে দূষণ থেকে রক্ষা করে।

কিডনির পাথর নিমূল করে
কিডনির পাথর নির্মূলে দুধের সঙ্গে কাঁকরোল বাটা উপকারী। কাঁকরোল খেলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

অতএব স্বগীয় ফল বলে পরিচিত এ সবজিটি কেন খাবেন না? নিয়মিত খান এ সবজি। থাকুন সুস্থ ও সুন্দর।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে গাপ্পি মাছ চাষ করুন পরামর্শ দিচ্ছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা

রাজ্য জুরে শুরু হয়েছে ডেঙ্গুর দাপাদাপি, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন বেশ কিছু লোক। সরকার এবং বিরোধীদের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে চাপান উতোর শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মীরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছেন ডেঙ্গু মোকাবিলায়। কিন্তু কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না ডেঙ্গুকে। এমত অবস্থায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে গাপ্পি মাছ ছাড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা। কি এই গাপ্পি মাছ, কোথায় থাকে, কি কাজ করে। কয়েকজন মৎস্য বিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে গাপ্পি একটি রঙীন মাছ লেজ ও পাখার উপর বিভিন্ন কারুকার্য করা থাকে। পুরুষ গাপ্পি নারী গাপ্পির থেকে আকারে ছোট হয়। হলদিয় বøকের মৎস্য সম্প্রসারন আধিকারিক সুমন সাউ বলেন গাপ্পি বাচ্চা মাছ জন্ম দেয়। গাপ্পি মাছ পেটের ভিতর তা দেয় এবং সেখানে বাচ্চার জন্ম নেয়। পুরুষ গাপ্পি ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং স্ত্রী গাপ্পি মাছ ২ থেকে ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এরা ২০ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এদের পছন্দ হয়। গত কয়েক বছর আগে দÿিন দমদম পৌরসভার উদ্যোগে কিছু গাপ্পি মাছ ছাড়েন নিকাশি নালায়, কিছুদিনের মধ্যে সাফল্য পাওয়া যায়। ১৯০৩ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে মশা প্রতিরোধ করার জন্য এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। গাপ্পি সাধারনত নোংরা ড্রেনে, পচাঁ পুকুরের জলাশয়ে থাকতে ভালোবাসে। ২৪ ঘন্টায় একটি গাপ্পি মাছ ৮০ থেকে ১০০ টি মশার লার্ভা খায়। একটা গাপ্পি মাছ এক সপ্তাহে ৫০ থেকে ২০০ টি বাচ্চা পাড়ে। আই.সি.এ.আর এর বিজ্ঞানী ড. বি.কে মহাপাত্র বলেন গাপ্পি সাড়া বছর বংশ বি¯Íার করেন। একবার জলাশয়ে ছাড়লে সারা বছর ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু রোগের বাহক মশার লার্ভা খেয়ে থাকে। এরা রাÿসে মাছ, তবে নিকাশি নালা ও নোংরা জলাশয়ে যেমন এরা থাকতে পারে তেমনি এ্যাকুরিয়ামে এদের খুব সহজেই লালন পালন করা যায়। দমদম টালিনালা ও বরাহনগরে প্রচুর পরিমানে গাপ্পি দেখা যায়। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কৃষি নিজ্ঞান কেন্দ্রের মৎস্য বিজ্ঞানী অলিন্দ নায়েক বলেন যদি কোনো পঞ্চায়েত বা পৌরসভা কৃষি নিজ্ঞান কেন্দ্রের কাছে মাছ কেনার জন্য আবেদন করে তাহলে আমরা মাছ পৌছে দিতে পারি। সেÿেত্রে মাছের সাইজ অনুযায়ী দাম পড়বে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা প্রতি হাজার। যেখানে লÿ লÿ টাকা খরচ করে ডেঙ্গু প্রাতরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না সেখানে মাত্র কয়েক হাজার টাকা খরচ করে গাপ্পি মাছ চাষ করলে মশা বাহিত রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

পলি হাউসে অর্কিড ফুলের চাষ – বছরে আয় পাঁচ লÿ টাকা

এক বছরে পনেরো কাঠা জমি থেকে ফুল বিক্রি করে পাঁচ লÿ টাকা আয়, কথাটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিজ্ঞানীরা হাতে কলমে চাষ করে প্রমান করেছেন অর্কিড ফুল চাষে এই লাভের অংকটা. বিজ্ঞানীদের এই ফুল চাষের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে দÿিন বঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর থেকে উত্তর চব্বিশ পরগনা এবং নদীয়া থেকে দÿিন চব্বিশ পরগনা জেলার অনেক কৃষক এই বিশেষ ধরনের ফুল চাষ শুরু করে দিয়েছেন এবং হাতে নাতে তার ফল পাচ্ছেন। অর্কিড ফুল সাধারনত পূজোর কাজে লাগে না। কোনো অনুষ্ঠান বা ঘর সাজাতে এর জুড়ি মেলা ভার. অর্কিড ফুল চাষের জন্য মাটির প্রয়োজন হয় না। মাটি থেকে তিন ফুট উচুতে মাচা তৈরি করে এর চাষ হয়। অর্কিড ফুল চাষ করতে গেলে ১৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা পছন্দ করে। তবে ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা হলে গাছ মারা যায়, সেই কারনে পলি হাউসে এর চাষ উপযুক্ত পরিবেশ। সারা পৃথিবীতে যে পরিমান অর্কিড ফুলের চাষ হয় তার ৪০% চাষ হয় হল্যান্ডে আর ৩০% চাষ হয় থাইল্যান্ডে। থাইল্যান্ডের অর্কিড ফুলের জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারতে অর্কিড ফুলের চাষ হয়। ইতিমধ্যে বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্কিড ফুল চাষের প্রশিÿন নিয়ে সাফ্যলের মুখ দেখতে শুরু করেছেন নদীয়া জেলার নাকাশি পাড়া বøকের কৃষক ভুষন দে ও ডহরখোলা গ্রামের আনন্দ বিশ্বাস। তারা সাড়ে সাত কাঠা জমিতে এই অর্কিড ফুলের চাষ শুরু করেছেন। প্রগতিশীল কৃষক ভুষন দে বলেন এতদিন পর্যন্ত আমরা পলি হাউসে জারবেরা ফুলের চাষ করতাম, বাজারে অর্কিড ফুলের চাহিদা থাকায় এই নতুন ফুল চাষ শুরু করলাম।আশা করি লাভের পরিমান অনেক বেশি থাকবে। বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিজ্ঞানী ড. তাপস চৌধুরী বলেন অর্কিড ফুল চাষে রোগ পোকার আক্রমন তেমন হয় না, বছরে দুবার ফুল পাওয়া যায় জুন জুলাই মাসে একবার আর অক্টোবর নভেম্বর মাসে আর একবার। ১৫ কাঠা পলি হাউসে ১০ হাজার চারা লাগানো যায়. একটা গাছ থেকে বছরে চারটে স্টিক পাওয়া যায়। প্রতিটি স্টিকে ৪ থেকে ১০ টি ফুল পাওয়া যায়। ৪ থেকে ৬ ফুলের স্টিকের বাজার দর দশ টাকা, ৬ থেকে ৮ টি ফুলের বাজার দর পনেরো টাকা এবং ৮ থেকে ১০ টি ফুলের একটি স্টিক বাজার দর কুড়ি টাকা।সবথেকে বাজার দর কম ধরলে এই ১০ হাজার ফুল গাছ থেকে বছরে চার লÿ টাকার ফুল বিক্রি হতে পারে। প্রথম অবস্থায় পলি হাউস তৈরি খরচ ১৫ লÿ টাক,া চারার দাম ২ লÿ টাকা। তবে উদ্যান পালন দপ্তরের কাছে আবেদন করলে অধের্ক টাকা ছাড় পেতে পারেন কৃষকরা। মাটি থেকে তিন ফুট উচুতে মাচা তৈরি করে কোকোবøকে এর চাষ হয়। এন.পি.কে সার মাঝে মাঝে জলে গুলে স্প্রে করতে হয়। সাতটি ফুলের জাত যেমন ডেনডোরিয়াম, নোবিলিস, সোনিয়া, পিঙ্ক স্টিক, পি.এইচ, স্টেল রেড, বি হোয়াইট জাম্বো চাষ করা যেতে পারে। একবার চাষ করলে কম করে ৮ বছরে এর থেকে ফলন পাওয়া যাবে।